
বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যে ভাল সম্পর্ক জরুরী, যার অভাব দেখা যাচ্ছে এখন। সেজন্যই দক্ষিণ ভারতে যাবার প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়ে গেলেন মণিপাল হাসপাতালের ডিরেক্টর তথা নিউরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. জয়ন্ত রায়। শনিবার বর্ধমানের একটি হোটেলে মুকুন্দপুরের মণিপাল হাসপাতালের উদ্যোগে আয়োজিত হয় ‘অন্বেষণ – মেডিক্যাল এডুকেশন ফর মিডিয়া’ শীর্ষক একটি সচেতনতা শিবির। এদিন সাংবাদিকদের জন্য মিডিয়া প্রিভিলেজ কার্ডেরও উদ্বোধন করা হয়। অন্যান্যদের মধ্যে এদিন উপস্থিত ছিলেন নেফ্রোলজি ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যাণ্ট বিভাগের ক্লিনিক্যাল প্রধান ডা. অভিনন্দন বন্দোপাধ্যায়, বর্ধমানের কনসালট্যান্ট ফিজিশিয়ান ডা. সৌম্য সরকার প্রমুখরা। এর পাশাপাশি জেলার সেইসব রোগীরাও অংশ নেন যারা বর্তমানে মণিপাল হাসপাতালে এই বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন। সেশনে বিশেষজ্ঞরা স্নায়ু ও কিডনি রোগের পরিবর্তিত প্রবণতা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের গুরুত্ব এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়ে আলোকপাত করেন। একই সঙ্গে, সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর সুস্থতা ও চিকিৎসার ফলাফলে যে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাও তাঁরা তুলে ধরেন। ডা. জয়ন্ত রায় এদিন বলেন, চিকিৎসকের সঙ্গে রোগীর সম্পর্ক ভাল করার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে নিজের ঐচ্ছিক বিষয়। চেষ্টা করলেই সেটা করা সম্ভব। ডাক্তারের কাছে রোগী যেমন রোগ সম্পর্কে কিছু গোপন করলে তার সুচিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়, তেমনি চিকিৎসকেরও রোগী ও রোগীর চিকিৎসা সম্পর্কে কোনো কিছু গোপন করা উচিত নয়। তিনি বলেন, এই জন্যই দক্ষিণ ভারতে যাবার প্রবণতা বাড়ছে। আর সেখান থেকে ফিরে এসে প্রায় প্রত্যেকেই জানান, সেখানকার ব্যবহার অত্যন্ত ভাল। ডা. রায় এদিন বলেন, অনেকে তাঁর কাছে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ রয়েছেন। কিন্তু তাঁরাও যেমন তাঁর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, তিনিও তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। এরফলে একটা ভাল সম্পর্কের বন্ধন তৈরী হয়।
স্নায়ুবিষয়ক উদ্বেগ নিয়ে ডা. জয়ন্ত রায় বলেন, গত দশ বছরে ভারতে স্নায়ুরোগ প্রায় ৩০–৪০ শতাংশ বেড়েছে। স্ট্রোক ও ডিমেনশিয়া এখন সবচেয়ে উদ্বেগজনক সমস্যা। মণিপাল হাসপাতালে ‘কমপ্রিহেন্সিভ নিউরো টিম’-এ রয়েছেন নিউরোলজিস্ট, নিউরোসার্জন, নিউরো–ইন্টারভেনশন বিশেষজ্ঞ, নিউরো–রেডিওলজিস্ট এবং নিউরো–রিহ্যাবিলিটেশন বিশেষজ্ঞরা—যারা মিলে রোগীকে সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ সেবা দেন। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতায় পেডিয়াট্রিক আইসিইউ, স্ট্রোক প্রিভেনশন ক্লিনিক, নিউরোভাসকুলার রিসার্চ ইউনিট এবং জরুরি নিউরোলজি ক্লিনিকের মাধ্যমে প্রাথমিক স্ক্রিনিং থেকে উন্নত নিউরোইমেজিং ও পুনর্বাসন—সবই সহজলভ্য। সময়মতো সঠিক চিকিৎসা রোগীর বাঁচার সম্ভাবনা ও দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্কের সুস্থতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে সাহায্য করে বলে জানান ডা. জয়ন্ত রায়।
সময়মতো শনাক্তকরণ ও সমন্বিত কিডনি চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, মণিপাল ইনস্টিটিউট অফ নেফ্রোলজি অ্যান্ড ইউরোলজি (MINU)-র মাধ্যমে তাঁরা জটিল কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডায়ালিসিস ও কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টসহ সর্বাঙ্গীণ ও রোগীকেন্দ্রিক চিকিৎসা প্রদান করেন, যা একটি শক্তিশালী মাল্টিডিসিপ্লিনারি কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। মণিপাল অর্গান শেয়ারিং অ্যান্ড ট্রান্সপ্ল্যান্ট (MOST) প্রোগ্রামের সঙ্গে তাঁদের সমন্বয় ট্রান্সপ্ল্যান্ট প্রক্রিয়াকে আরও সুসংগঠিত করে, দেরি কমায় এবং রোগী ও তাঁদের পরিবারের জন্য পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময়মতো রোগ নির্ণয়—কারণ প্রায় ১৭ শতাংশ কিডনি ফেলিওরের ঘটনা দেরিতে ধরা পড়ে, যখন ক্ষতি ইতিমধ্যেই স্থায়ী হয়ে যায়। দীর্ঘদিন ফোলা থাকা, প্রস্রাবের ধরণ বদলে যাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ বা অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের মতো উপসর্গ অনেকসময় অবহেলিত হয়। চিকিৎসার পাশাপাশি দাতা এবং গ্রহণকারী উভয়ের মানসিক প্রস্তুতি, নিয়মিত ফলো–আপ, কাউন্সেলিং এবং ওষুধের নিয়ম মেনে চলা দীর্ঘমেয়াদে ট্রান্সপ্ল্যান্টের সফলতা, আয়ু বৃদ্ধি ও রোগীর উন্নত জীবনমান নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান ডা. অভিনন্দন বন্দ্যোপাধ্যায়।