
ভাতার (পূর্ব বর্ধমান) :- ‘কালো তালিকাভুক্ত’ শিল্পী পল্লব কীর্ত্তনীয়া-র গানের অনুষ্ঠান বাতিলের অভিযোগ ঘিরে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হল পূর্ব বর্ধমানের ভাতারে। বুধবার থেকে ভাতার ব্লক আপডেট খবর ২৪×৭ এর পরিচালনায় গ্রন্থাগার দপ্তরের সহযোগিতায় শুরু হচ্ছে ‘ভাতার বইমেলা ও উৎসব’। ভাতাড় মাধব পাবলিক হাইস্কুল মাঠে আয়োজিত এই মেলা ও উৎসবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসছেন কলকাতা থেকে শিল্পীরাও। উদ্যোক্তাদের পক্ষে কন্ঠশিল্পী পল্লব কীর্ত্তনীয়াকে আগামী ২৫ ডিসেম্বর গানের অনুষ্ঠানের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি সম্মত হওয়ার পর আয়োজকদের তরফে পল্লব কীর্ত্তনীয়ার ছবি সম্বলিত ব্যানার টাঙানো হয় বিভিন্ন জায়গায়। কিন্তু এরপরই খোদ পল্লব কীর্তনিয়া সমাজ মাধ্যমে সোমবার পোষ্ট করে ভাতারে তাঁর অনুষ্ঠান বাতিলের বিষয়টি তুলে ধরেন।
শিল্পী পল্লব কীর্ত্তনীয়া নিজে ফেসবুকে পোস্ট করে অভিযোগ করেন, “‘জাগো মা’ শীর্ষক একটি গান গাইবার পর ভগবানপুরে কোনো মঞ্চে লগ্নজিতাকে সেকুলার গান গাইতে বলে অপমান করে গ্রেফতার হয়েছেন এক ব্যক্তি। এ নিয়ে মিডিয়ায় স্বাভাবিকভাবেই শিল্পীর স্বাধীনতা নিয়ে বিস্তর চর্চা শুরু হয়েছে। এটা যে ঘোরতর অন্যায় তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হওয়াই উচিত। আমার কাছে দুটো টিভি চ্যানেল থেকে প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছিল আমি আমার প্রতিবাদ জানিয়েছি, এখানেও তীব্র নিন্দা করছি এবং একজন কণ্ঠশিল্পী হিসেবে লগ্নজিতার পাশে দাঁড়াচ্ছি। কিন্তু এই প্রসঙ্গে এখানে অন্য একটা ঘটনার কথা না উল্লেখ করে পারছি না। বর্ধমানের ভাতারে একটি বইমেলায় আমাকে শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন উদ্যোক্তারা। ২৫ ডিসেম্বর আমার সেখানে গান গাইবার কথা ছিল। কিন্তু শুনলাম শাসকের প্রবল চাপে শেষ মুহূর্তে আমার অনুষ্ঠান তাঁরা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন।
এ ঘটনা গত দশ বছরে কত অসংখ্যবার যে হয়েছে আমার সঙ্গে তার ইয়ত্তা নেই। এই যে দেখুন গানমেলা শুরু হচ্ছে। কত বছর সেখানে ডাক পাই না! শুধু সেখানে কেন যে কোনো সরকারি বেসরকারি অনুষ্ঠানেই আমি কালো তালিকাভূক্ত। যে কোনো সংগঠন আমাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে গেলে প্রবল বাধাপ্রাপ্ত হবেন। লগ্নজিতাকে যে ভাষায় অপমান করা হয়েছে তার চেয়ে ঢের ঢের তিন অক্ষর চার অক্ষরের গালাগালি শুনেছি এমনকি এই খোদ কলকাতার রবীন্দ্রসদন মঞ্চে। শারীরিক নিগ্রহের হুমকি ছেড়েই দিলাম।
এ নিয়ে আমি বলি না আর কিছুই কারণ আমি জানি শাসকের বিরুদ্ধে গাইলে শাসক প্রত্যাঘাত করবেই। আর যখন মূল ইন্ডাস্ট্রির শিল্পীকূল থেকে আমি পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, নেহাতই একা, তাই সইতে হবে একাই! তবে এটুকু বলা ভালো আজ যারা মঞ্চে নিয়মিত অনুষ্ঠানে ডাক পাচ্ছেন তারা শাসকের সুনজরে আছেন বলেই পাচ্ছেন। শিল্পীর স্বাধীনতা আছে কতটুকু সেটা শাসকের সুনজরের বলয়ে থেকে বোঝা অসম্ভব। শাসকের এই সকল চুরি, দুর্নীতি, ফেরেব্বাজি, ধর্মবাজি নিয়ে একটা গান করলে তখন বোঝা যাবে শিল্পীর স্বাধীনতা কতটুকু এ রাজ্যে।
লগ্নজিতার পাশে এসে সঙ্গত কারণে দাঁড়িয়েছেন যে শিল্পীরা তাঁদের আমার পাশে দাঁড়াতে বলার মত দেউলিয়া হয়ে যাইনি এখনো। তবে চুরির সাম্রাজ্য বিস্তার করা এই রাজ্যে সমাজের শিরদাঁড়া শিক্ষাব্যবস্থাকেও ধ্বংস করে দিল একটা নির্বাচিত সরকার! দুর্নীতি করে করে, পকেট ভরে ভরে আস্ত যে একটা প্রজন্মকে শেষ করে দিল, অন্তত তাঁদের জন্য দোহাই একটা গান করুন। নিজের বিবেকের পাশে দাঁড়ান, অন্তত একটিবার!”
যদিও অভিযোগ মানতে নারাজ উদ্যোক্তা থেকে শাসকদল তৃণমূল। ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক। শিল্পী অভিযোগ করেন, শাসকের প্রবল চাপে শেষ মুহূর্তে তাঁর অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ ব্যাপারে বিজেপির যুব মোর্চার বর্ধমান বিভাগের কনভেনার সৌমেন কার্ফা জানান, রাজ্যে যে গণতন্ত্র নেই শুধু আমরা বলছি না, শিল্পীরা নিজেরাও বলছেন। লগ্নজীতার সাথে ঘটা ঘটনার প্রতিবাদ করায় শাসকের চাপে অনুষ্ঠান বাতিল করেছে উদ্যোক্তরা। নিন্দাজনক। অন্যদিকে, এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক বাগবুল ইসলাম। তিনি জানান, তৃণমূল কংগ্রেস শিল্পীর স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে। এই বাংলায় সবার নিজের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তিনি জানান, কী কারণে ওই অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে তা আয়োজকেরা জানেন। তবে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে এর কোনোও যোগ নেই। অন্যদিকে শিল্পী পল্লব কীর্ত্তনীয়ার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ভাতার বইমেলা ও উৎসবের আয়োজক মধুসূদন কোঙার বলেন, আমরা যে পরিমাণ বিজ্ঞাপন পাবো ভেলেছিলাম তা পাইনি। ওনার সম্মানিক ভাতা ঠিকমতো দিতে পারব না বলেই আমরা বারণ করেছি। শাসকদলের তরফে আমাদের ওপর কোনো চাপ দেওয়া হয়নি।