‘ব্লাড কার্ড’ আর একটা লেখা আর চাইবেন না ‘শাপলা শালুক’ পত্রিকার প্রয়াত সম্পাদক রাজা দেবনাথ
admin
বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- থ্যালাসেমিয়ায় থেমে গেছে ‘শাপলা শালুক’ লিটল ম্যাগাজিনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, সাংবাদিক রাজা ওরফে উজ্জ্বল দেবনাথের জীবন। রবিবার বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় তাঁকে বিশেষভাবে স্মরণ করতে ও শ্রদ্ধা জানাতে বর্ধমান শহরে তাঁর অফিসার্স কলোনির বাড়িতে হয়ে গেলো রাজা দেবনাথের স্মরণ সভা। এদিনের এই স্মরণসভা পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন সাংবাদিক পার্থ চৌধুরি। এদিন বর্ধমানের সংস্কৃতি, সঙ্গীত, বাচিকশিল্প এবং সাংবাদিকতা জগতের ব্যক্তিত্বরা স্মরণ করলেন রাজাকে। সভা শপথ নিল তাঁর দিয়ে যাওয়া কিছু কাজকে সম্পন্ন করার। পার্থ চৌধুরি জানিয়েছেন, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে থ্যালাসেমিয়ার প্রভাবে থেমে গেছে রাজা দেবনাথের জীবন। মা গীতা দেবনাথ এবং বাবা রমেন্দ্র কুমার দেবনাথ আর পাঁচজন মা-বাবার মতো স্বাভাবিকভাবে তাঁদের ছেলেকে পাননি। মাত্র দেড় বছর বয়সেই রাজার ধরা পরে মারণ রোগ থ্যালাসেমিয়া। তখন থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে এতটা প্রচার ছিল না। শুরু হলো ছেলের জীবন বাঁচাতে যুদ্ধ। মাত্র ১০ বছর বয়সে চিকিৎসার জন্য কলকাতা নিয়ে যাওয়া হয় রাজাকে। মেদিনীপুরের একটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপিকা রাজার বোন শুভ্রা দেবনাথ জানান, ছোট থেকেই দেখে আসছেন তাঁর দাদা মানে ‘ব্লাড কার্ড’ আর চিকিৎসা। আর পাঁচজনের মতোই তাঁর দাদাও স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখত, যুক্ত ছিল সাংবাদিক সংগঠন-সহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গেও। দাদার থ্যালাসেমিয়া অসুখটি ভালো করার জন্য তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, তাঁর বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াবেন এবং দাদার চিকিৎসার খরচ সে জোগাড় করবেন। সেই কারণে তাঁর একটাই লক্ষ্য ছিল, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। এদিনের স্মরণ সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বোন শুভ্রা দেবনাথ জানান, দাদার থ্যালাসেমিয়া ছিল ঠিকই কিন্তু তাঁর প্রিয় ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘শাপলা শালুক’ প্রকাশের জন্য লেখা সংগ্রহ করতে নিয়মিত সকলের কাছে ছুটে যেতেন। দাদার এই ইচ্ছে দেখে তাঁর পাশে অনেক সাহিত্যিক, সাংবাদিক একসময় এসে দাঁড়িয়েছেন। এদিন ‘শাপলা শালুক’ পত্রিকার শেষ সংস্করণ প্রকাশিত হলো। সকল অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হল সেই পত্রিকা। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন তাঁর মা গীতা দেবনাথ। রাজা দেবনাথ ভালোবাসতেন কবিতা লিখতে। শুভ্রা দেবনাথ জানান, একসময় মানসিকভাবে হতাশ হয়ে রাজা তাঁর লেখা ডায়েরী পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। জীবনের শেষ প্রায় ছয় মাস তিনি নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন সকলের কাছ থেকে। রোগের প্রকোপে তাঁর সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তাঁর একটাই চাহিদা ছিল একটা ‘ব্লাড কার্ড’ আর একটা লেখা। এদিনের এই স্মরণ সভায় উপস্থিত ব্যক্তিরা কবিতা, গান এবং স্মৃতিচারণার মধ্যে দিয়ে তাঁকে স্মরণ করেন। স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব দেবেশ ঠাকুর, বর্ধমান মিউনিসিপাল হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক অরুনাভ চক্রবর্তী, গবেষক কবিতা মুখোপাধ্যায়। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন, সাংবাদিক ঋষিগোপাল মন্ডল, দীনেশ ঝাঁ, অরূপ লাহা, কিশোর মাকর, সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রীতিলতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সৌমিত্র হাজরা, সাংবাদিক ও বাচিকশিল্পী শ্যামাপ্রসাদ চৌধুরি, পম্পা দাস কান্ত, শেখ জাহাঙ্গির। ছিলেন সংগীত শিল্পী সুমন্ত্র ভট্টাচার্য, লেখক পঙ্কজ পাঠক-সহ বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক জগতের মানুষেরা। রাজা দেবনাথের মা গীতা দেবী এবং বোন শুভ্রার বক্তব্য, আর যেন কারো থ্যালাসেমিয়া না হয় সেই প্রচারে এগিয়ে আসুন সবাই। আর যেন কেউ এইভাবে চলে না যায়। এদিন সভায় গান, কবিতা, কথায় রাজাকে স্মরণের পাশাপাশি কিছু আন্তরিক প্রস্তাব দেন উপস্থিত বিশিষ্টজনেরা। আলোচনা হয় এই শহরের অনুপম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সাংবাদিকতা নিয়ে। সভায় ঠিক হয়, রাজার স্মরণে একটি কদম গাছ লাগানো হবে বর্ধমান শহরে। ঠিক হয়, রাজার স্বপ্ন ‘শাপলা শালুক’ পত্রিকার নামটিকে বাঁচিয়ে রাখতে একটি অনলাইন পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়াও থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধে প্রচারকে ছড়িয়ে দেবার চেষ্টা করা হবে। এদিনের স্মরণসভাটি আয়োজিত হয় রাজা দেবনাথের বৃহত্তর পরিবার এবং তাঁর আত্মজনেদের উদ্যোগে। কোনো সংগঠনের ব্যানার রাখা হয়নি।