E Purba Bardhaman

বর্ধমানের মহন্তস্থলের জায়গা নিয়ে তীব্র চাপান-উতোর

A fierce dispute has erupted between two parties over the ownership of the land at the Mahanta Asthal in Burdwan.

বিপুন ভট্টাচার্য, বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- বর্ধমান শহরের রাজগঞ্জ মহন্তস্থলের কয়েকশো বছরের পুরনো রাধা দামোদর মন্দির এবং তার সম্পত্তি নিয়ে বিবাদ এবার চরমে উঠলো। মোহন্তস্থলের নিম্বার্ক আশ্রমের ট্রাষ্টি বোর্ড ‘শ্রী শ্রী রাধাদামোদর জীউ সেবা ট্রাষ্ট’ বনাম বর্ধমান হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মধ্যে চলতে থাকা এই বিবাদে উভয়পক্ষই দাবী করেছেন আদালত তাঁদের পক্ষেই রায় দিয়েছেন। বুধবার সাংবাদিক বৈঠকে মোহন্তস্থলের শ্রী শ্রী রাধাদামোদর জীউ সেবা ট্রাষ্ট-এর সম্পাদক তপন চন্দ্র, সহসভাপতি শ্যামলেন্দু চট্টোপাধ্যায়, আশ্রমের মোহন্ত ভক্তিপ্রকাশ আশ্রম মহারাজ প্রমুখরা জানিয়েছেন, ১৭০৬ সালে প্রায় ৭ একর এই জায়গার মধ্যে মহন্তস্থল (মোহন্তস্থলের) এই মন্দির নির্মাণ করেন মধুসূদন শরণদেব মোহন্ত। পরবর্তীকালে ১৯৭৯ সাল থেকে এই মন্দির সংকটে পড়তে শুরু করে। এদিন শ‌্যামলেন্দুবাবু অভিযোগ করেন, ১৯৭৩ সালে আচার আচরণগত ত্রুটির জন্য তৎকালীন মোহন্ত রাধাকান্ত শরণদেব মোহন্তকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। তার আগে ১৯৭১ সাল নাগাদ এক মোহন্ত খুন হন। তারপর থেকেই ডামাডোল শুরু হয়। ১৯৭৩ সালে রাধাকান্ত শরণদেবকে বহিষ্কার করার পর রামকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তিকে পাওয়ার অব এটর্নি নিয়োগ করে এই মন্দিরের জায়গা হোমিওপ্যাথি কলেজের হাতে তুলে দেওয়া হয়। শ্যামলেন্দুবাবু জানিয়েছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। তিনি এদিন জনিয়েছেন, দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর এই মন্দিরে কেউ আসতেন না। জলাজঙ্গলে পরিণত হয়েছিল। সম্প্রতি মন্দিরের একটি বৃহত অংশ ভেঙে পড়ে। তারপর থেকেই বিতর্ক আরও বেড়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে দফায় দফায় মন্দিরের মোহন্ত ও কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। গত ২৩ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মন্দিরের বাৎসরিক অনুষ্ঠানের পরই সেখানে হামলা চালানো হয়। বর্তমান মোহন্ত ভক্তিপ্রকাশ আশ্রম মহারাজকে হেনস্থা করা হয় বলেও অভিযোগ। এব্যাপারে পুলিশে অভিযোগ করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। শ্যামলেন্দুবাবু জানিয়েছেন, এটা হেরিটেজ ভবন বলে শুনেছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হেরিটেজ কমিশন এখনও পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি জানিয়েছেন, গোটা বিষয়টি নিয়ে হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় বিচারক হোমিওপ্যাথি কলেজের মালিকানা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে বলে দাবী করেছেন তিনি। তিনি জানিয়েছেন, গোটা বিষয় নিয়ে তাঁরা আইনানুগ লড়াই চালিয়ে যাবেন। অন্যদিকে, এব্যাপারে হোমিওপ্যাথি কলেজের ডিরেক্টর ডা.অসীম কুমার সামন্ত, অধ্যক্ষা ডা. সুস্মিতা চ্যাটার্জ্জী এবং ডেপুটি সুপার ডা. অনুপ প্রসাদ গুপ্তারা জানিয়েছেন, মন্দিরের ট্রাষ্ট কমিটির বক্তব্য সম্পূর্ণই মিথ্যে। তাঁদের কাছে পর্যাপ্ত কাগজপত্র রয়েছে যে এই সম্পত্তি কলেজের। তাঁরা এদিন পাল্টা জানিয়েছেন, ওই মন্দিরের জায়গা দখল করে সেখানে প্রোমোটারী করার অভিসন্ধি রয়েছে। তা তাঁরা কিছুতেই হতে দেবেন না। তাঁরা চান এই ঐতিহ্যপূর্ণ মন্দির থাকুক। এর আগে তাঁরাই মন্দিরের পুজা অর্চনা এবং সংস্কারের কাজ করেছেন। ভবিষ্যতেও করবেন। কিন্তু তাঁদের নামে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে। তাঁরা জানিয়েছেন, কলেজের ছাত্রছাত্রীরা মোটেই হামলা চালায়নি। তাঁরা জানিয়েছেন, গোটা বিষয়টি আদালতের বিচারাধীন। আদালত যে রায় দেবেন সেই অনুযায়ীই তাঁরা চলবেন। এই হেরিটেজ তকমা পাওয়া মন্দিরের রক্ষাণাবেক্ষণে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য হেরিটেজ কমিশনের সঠিক ভূমিকা নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, তাঁদের কাছে জমির মালিকানা সংক্রান্ত সমস্ত নথীই আছে। উদ্দেশ্যমূলক ভাবেই তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁরা এও প্রশ্ন করেন তাঁদের মালিকাধীন মোহন্তস্থলের নিম্বার্ক সম্প্রদায়-এর এই মন্দির কয়েক বছর আগে গৌড়ীয় মঠ কর্তৃপক্ষের অধীনে কীভাবে গেল?
ওয়েস্টবেঙ্গল হেরিটেজ কমিশন সূত্রে জানাগেছে, ২০০৭ সালে মহন্তস্থলকে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন হেরিটেজ হিসাবে ঘোষণা করে। মহন্তস্থলটি ঐতিহাসিক এবং স্থাপত্য উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। নরহরি দেব এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। নরহরি দেব ১৮ শতকের গোড়ার দিকে পাঞ্জাবের খারা অঞ্চল থেকে বর্ধমানে এসেছিলেন। তিনি নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের একজন সাধক ছিলেন – চারটি প্রধান বৈষ্ণব দার্শনিক বিদ্যালয়ের মধ্যে একটি। তাঁর শিষ্য দয়ারাম গোস্বামী বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন। তিনি গোপাল জিউর একটি মন্দির এবং মঠের মঠপতি মহন্তের বাসস্থান নির্মাণ করেছিলেন। ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি ইউরোপীয় রীতিতে নির্মিত হয়েছিল। পরে বাসস্থানটিকে একটি ডেন্টাল কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। কাঠামোটি ইসলামিক এবং ইউরোপীয় স্থাপত্য শৈলীর মিশ্রণ।

Exit mobile version