
বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- আচমকা বর্ধমান রাজবাড়ির লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরের নাট মন্দির ভেঙ্গে পড়ায় অনিশ্চিত হয়ে পড়লো বর্ধমান রাজবাড়ির ঐতিহ্যবাহী পটেশ্বরী দুর্গাপুজো। মঙ্গলবার গভীর রাতে ভেঙে পড়লো বর্ধমান রাজপরিবারের ‘বর্ধমান দেব সেবা মাহতাব ট্রাস্ট’-এর লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরের নাটমন্দিরের একাংশ। বর্ধমান শহরের সোনাপট্টি এলাকায় এই মন্দির। এখানেই হয় রাজপরিবারের ঐতিহ্যবাহী পটেশ্বরী দুর্গাপুজো। লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরের প্রধান পুরোহিত উত্তম মিশ্র জানিয়েছেন, এটা বহু পুরোনো মন্দির। রক্ষণাবেক্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে। কয়েক মাস ধরে টানা বৃষ্টির জন্যই এই ঘটনা ঘটেছে। গোটা মন্দিরেরই অবস্থা খারাপ। মালিককে আমরা বলেছি। তিনি আগে রাবিশগুলো সরানোর ব্যবস্থা করতে বলেছেন। তারপর যা করার করবেন। রাত ১ টা কাছাকাছি এই ঘটনা ঘটেছে। এই মন্দিরে নিত্য পুজোর পাশাপাশি ঝুলন, জন্মাষ্টমী, রথ, দুর্গাপূজা, বাসন্তী পুজো হয়। নবরাত্রির ডান্ডিয়া নাচ হয়। এই অবস্থায় এবার আর দুর্গা পুজো আগের মতো হবে না। ১২ বছর অন্তর এই পটেশ্বরী দুর্গার রং করা হয়। সেই হিসাবে এই বছর রং হওয়ার কথা, কিন্তু হবে না। পটের দুর্গায় রং ছুঁয়েই নিয়ম রক্ষা করা হবে। প্রাক্তন মহারাজ কুমার ডক্টর প্রণয় চাঁদ মাহতাবের ২০২৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মৃত্যু হয়েছে। তাঁর এই মৃত্যুর কারণেই এবার এবছর রং করা হচ্ছে না।
বর্ধমান রাজ এস্টেটের ম্যানেজার জয় চাঁদ চ্যাটার্জী জানিয়েছেন, রাজ পরিবারের সেই ঐতিহ্য এখন আর নেই। জমিদারি চলে যাওয়ার পর থেকে সেই জাঁকজমকও সব শেষ হয়ে গেছে। পুজো কোনও রকমে হয়। নিত্য সেবার খরচ আছে। ৩৮ জন কর্মী আছেন। এস্টেটের কর্মীদের যা মাইনে তা বলার মতো নয়। প্রায় সমস্ত বর্ধমান-ই রাজার দান। পূর্বতন নায়েব, ম্যানেজার যারা ছিলেন তাঁরা রাজ সম্পত্তির অনেক ক্ষতি করে দিয়ে গেছেন। বহু সম্পত্তি বে-দখল হয়ে গেছে। বহু সম্পত্তি ওনারা দান করে দিয়েছেন। বহু সম্পত্তি ভেস্ট হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে রাজবাড়ির যা অবস্থা মন্দিরগুলো সংস্কার করার মতো আর্থিক সঙ্গতি নেই। তবুও তিনি চেষ্টা করেছিলেন কোনও প্রমোটারকে দিয়ে তাঁদের সাথে আলোচনা করে মন্দিরগুলোকে রেখে নির্দিষ্ট শর্তে তাঁরা ব্যবসা বা যা করার করবেন। তাঁরাই মন্দিরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করবেন। এতে তেমন কেউ এগিয়ে আসেননি। এটায় রাজ পরিবারের পক্ষ থেকেও তেমন কোনও প্রচেষ্টা ছিল না। বহু চেষ্টা করেছেন যে সম্পত্তিগুলো এখনও পরে আছে সেগুলো কাউকে ধরে উদ্ধার করে মন্দিরগুলোকে যাতে বাঁচান যায়। মহারাজ কুমার ডক্টর প্রণয় চাঁদ মাহতাব অত্যন্ত শান্ত প্রকৃতির মানুষ ছিলেন, কোনও রকম ঝামেলায় যেতে চান নি। লক্ষ্মীনারয়ণ জিউ মন্দির ভেঙে গেছে এই খবর রাজবাড়িতে পাঠানো হয়েছে, তাঁরা যা করার করবেন। তিনি আপাতত পূজারিদের মন্দির বন্ধ করে দিতে বলেছেন, তালা বন্ধ করে দিতে বলেছেন। কাউকে ঢুকতে নিষেধ করে দিয়েছেন। দুর্গা পুজোর কী হবে? এই প্রসঙ্গে জয় চাঁদ চ্যাটার্জী জানিয়েছেন, তিনি বলতে পারছেন না। রাজ বাড়ির কী হচ্ছে, কী হবে, কী করা হবে তা তাঁরা বলতে পারবেন না। অন্ধকারে আছেন। বলতে লজ্জা লাগে। রাজবাড়ি যা ভালো বুঝবে করবে। তিনি বলেন, প্রণয় চাঁদ মাহতাবের পুত্র তাঁর পরিবার নিয়ে বিদেশে থাকেন, স্ত্রীও অসুস্থ। ভাইপো দেখভাল করেন, সবকিছু বিদায় করে দিতে পারলেই বাঁচেন।
এ ব্যাপারে আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষক শ্যামসুন্দর বেরা জানিয়েছেন, তেজ চাঁদ এই মন্দিরের কাজের সূচনা করেন। ১৮৩২ সালে তেজ চাঁদের মৃত্যু হয়। মূল রাজবংশ এখানে শেষ হয়। এরপর দত্তক বংশ শুরু হয়। দত্তক পুত্র মহতাব চাঁদ এই মন্দির তৈরি সম্পন্ন করেন। উনিশ শতকের মাঝামাঝি শেষ হয়। এখানে লক্ষ্মী নারায়ণ শীলায় পুজো হয়। এছাড়াও বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি রয়েছে, সেগুলোর পুজো হয়। এটা রাজ পরিবারের চন্ডি মন্দিরও। নিত্য পুজো হয়। দুর্গা পুজো দুবার হয়। শারদীয়া দুর্গাপুজো হয়, আবার বাসন্তী পূজাও হয়। এই নাট মন্দিরেই পটেশ্বরী দুর্গার পুজো হয়। কুমারী পুজো হয়। জমিদারি উচ্ছেদের পর থেকেই আর এইসবগুলো দেখভাল করা হয় না, সংস্কারের কাজ হয় না। তাঁর ফলশ্রতিতেই এই নাটমন্দির ভেঙে পরলো। গত ৩০ বছর ধরে এখানেই গুজরাটিদের গরবা অনুষ্ঠান হয়। নবরাত্রিতে ডান্ডিয়া নাচ হয়। জলরাম বাপার জন্মদিনও এই নাট মন্দিরে পালিত হয়। এবছর পুজোর ১ মাস আগে এই ঘটনা ঘটলো। ফলে এবারের পুজো অনিশ্চয়তার মধ্যে পরে গেল। তিনি বলেন, এই মন্দিরের গঠনশ্যৈলী অসাধারণ। সমতল ছাঁদ যুক্ত, পীলার এবং আর্চের উপর নির্মাণ, পঙ্খের কাজ আছে। বর্ধমান শহরের আঞ্চলিক ইতিহাসে যেসমস্ত স্থাপত্য-ভাস্কর্য রয়েছে সেগুলোর মধ্যে একটা বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেলো। একটা প্রাচীন স্থাপত্য ধ্বংস হয়ে গেলো। এটা এখন আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা খুবই কষ্টের কাজ, তবে একেবারেই অসম্ভব নয়। তবে এই ধরনের ভেঙ্গে যাওয়ায় ঘটনা বিশেষ কারণে অনেকেরই উপকার হয়। তাঁরা চান ভেঙে পড়ুক। পরে সেই রাবিশ সরিয়ে অন্যকাজে জায়গাটা ব্যবহার করা যাবে। তিনি বেশ কয়েকবার গিয়ে দেখেছেন প্রত্যেকদিন দুপুরে এই মন্দির বন্ধ হলেই নেশাখোরদের আড্ডা হয়ে যায়।
ইতিহাস গবেষক সর্বজিৎ যশ জানিয়েছেন, বর্ধমান শহরে বর্ধমান রাজবংশের সর্বপ্রাচীন নির্মিত গৃহ হল লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দির এবং অট্টালিকা। যতদূর জানা যায় এই মন্দির এবং গৃহ তৈরি করেছিলেন ঘনশ্যাম রাই। ঘনশ্যাম রায়ের মৃত্যু হয় ১৬৭৫ খ্রিস্টাব্দে। এই লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরেই অবস্থান করেন রাজ বংশের আদিপুরুষ সঙ্গম রাই কর্তৃক পাঞ্জাব থেকে নিয়ে আসা কুলদেবী চণ্ডীকা। তবে পরবর্তীকালে এই ভবনের বপু বৃদ্ধি হয়। জমিদারি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কাঞ্চননগরে নতুন রাজবাড়ি তৈরি হয়েছিল এবং আরোও পরবর্তীকালে ১৮৫৩ নাগাদ লক্ষ্মীনারায়ণ জিউ মন্দিরের পাশে মুঘল আমলের এক ভগ্নপ্রায় প্রাসাদকে সংস্কার করে তৈরি হয় বর্ধমান রাজবাড়ী, যা বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়। রাজবংশের শাসনকালে দীর্ঘ সময় জুড়ে এই লক্ষ্মীনারায়ন জিউ মন্দিরে চন্ডিকা দেবী ছাড়াও ঝুলন, রথযাত্রা ইত্যাদি পালিত হয়। একইসঙ্গে পালিত হয় রাজবাড়ির নিজস্ব পারিবারিক দুর্গা পটেশ্বরী দেবীর পূজা। এছাড়াও এই মন্দিরে রয়েছে গরুর দেবতা, রাখাল বেশি শিব, পাতালেশ্বর শিব প্রভৃতি বেশ কিছু দেব-দেবী। ভবনটি দীর্ঘদিন ভঙ্গুর অবস্থায় ছিল। আজ ভবনের নাট মন্দিরটি ভেঙে পড়ায় বর্ধমান শহরের এক প্রাচীন ঐতিহ্যের ধ্বংস শুরু হলো। যেহেতু বর্ধমান রাজবংশের বর্তমান সদস্যগণ এটি সংস্কারের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেন না, তাই প্রশাসনিক উদ্যোগে এই ভবনের সংস্কার প্রয়োজন। আশা করি প্রশাসনিক উদ্যোগে বর্ধমানের এই ঐতিহ্য রক্ষার চেষ্টা হবে।