বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশের পর বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অচলাবস্থা কাটাতে হাতুড়ি দিয়ে জরুরী বিভাগের গেটের তালা ভাঙা হল। খোদ বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সুপার ডা. উত্পল দাঁ, ডেপুটি সুপার ডা. অমিতাভ সাহা, বর্ধমান মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ সুহৃতা পাল প্রমুখদের উপস্থিতিতে এদিন জরুরী বিভাগের তালা শুধু ভাঙলেনই না, একইসঙ্গে জরুরী বিভাগের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সঠিক চিকিত্সা না পাওয়া রোগীদের দ্রুত জরুরী বিভাগে স্থানান্তরিত করে তাঁদের চিকিত্সাও করলেন তাঁরা। যদিও যে জুনিয়র ডাক্তাররা হাসপাতালের গেটে গেটে তালা ঝুলিয়ে গোটা স্বাস্থ্য পরিষেবাকে পঙ্গু করে তুলেছিলেন এদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের জোর করে তালা ভেঙে দেবার ঘটনায় কেউই কোনো মুখ খোলেননি। কার্যত মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশে এদিন বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষরা চিকিত্সা পরিষেবাকে পুনরায় স্বাভাবিক করতে উদ্যোগী হলেও মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশকে অমান্য করেই এদিন জুনিয়র ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া নির্দিষ্ট সময়সীমা পার করেও আন্দোলনে অনড় থাকলেন।
উল্লেখ্য, এনআরএস কাণ্ডে মঙ্গলবার থেকেই বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও ইন্টার্ণ ও জুনিয়র ডাক্তাররা আন্দোলনে নামেন। মঙ্গলবার বিকাল থেকেই তাঁরা জরুরী বিভাগের গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। মঙ্গলবার রাতেই রোগী ভর্তিকে কেন্দ্র করে রোগীপক্ষের সঙ্গে সংঘাতে জড়ান জুনিয়র ডাক্তাররা। মারধর করা হয় হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের পুলিশ কর্মীদের। এই ঘটনায় পুলিশ ক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়। পরের দিন বুধবার সকাল থেকেই জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন আরও উগ্র হয়ে ওঠে। হাসপাতাল ক্যাম্পাসের সমস্ত গেট বন্ধ করে সাধারণ মানুষ, রোগীদের হাসপাতাল ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়।
আর তাকে ঘিরেই রণক্ষেত্র হয়ে ওঠে হাসপাতাল চত্বর। ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ ও জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। এই সংঘর্ষের সময় মারধর করা হয় সংবাদ মাধ্যমকেও। সব মিলিয়ে আতংকে ভুগতে শুরু করেন রোগীরা। বাধ্য হয়েই রোগীদের হাসপাতাল থেকে বার করে নিয়ে যাওয়া হয়। বুধবার এই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্তও পরিস্থিতি একই থাকে। দুপুরে এসএসকেএমে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত হাসপাতালের অচলাবস্থা কাটানোর নির্দেশ দেন। আর তারপরেই খুলে দেওয়া জরুরী বিভাগ। খুলে দেওয়া হয় সমস্ত গেটের তালা।
এরই পাশাপাশি বিকালের দিকে আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের কাছে আসেন হাসপাতাল সুপার এবং ডেপুটি সুপার। সুপার জানিয়েছেন, ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি তাঁদের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু পরিষেবা বন্ধ করে আন্দোলন করা ঠিক নয় এটাই বোঝানো হয়েছে। হাসপাতাল সুপার জানিয়েছেন, শুক্রবার থেকে তাঁরা হাসপাতালের ওপিডিও চালু করবেন। পাশাপাশি হাসপাতালের সিনিয়র চিকিত্সক, অধ্যাপক চিকিত্সকদের দিয়ে পরিষেবা স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিয়েছেন।
যদিও গত ২দিনের মতই এদিনও সকাল থেকে হাসপাতালের আউটডোর সহ অন্যান্য বিভাগ বন্ধ থাকায় চরম সমস্যায় পড়েন রোগীপক্ষরা। সাঁইথিয়ার মহিষাডহরী থেকে বর্ধমান হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিত্সা করাতে এসেছিলেন আব্দুর রেজ্জাক। জানিয়েছেন, অনেক কষ্ট করে তিনি হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু এসে দেখলেন সব বন্ধ। কোনো চিকিত্সাই হবে না। বিহার থেকে শরীর ফুলে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে এসেছিলেন এক মহিলা। বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিস্থিতি সম্পর্কে তাঁর কোনো কিছু জানা ছিল না।
বর্ধমান হাসপাতালে এসে দেখলেন সব কিছু বন্ধ। এত খরচ করে এসেও বাধ্য হয়েই তাঁদের ফিরে যেতে হচ্ছে বিহারে। বীরভূম থেকে একটি শিশু মৃত্যুর ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিতে এসে ফিরে গেলেন বদরউদ্দিন সেখ। অপারেশন সংক্রান্ত বিষয়ে রোগীকে নিয়ে এসেছিলেন পুলক মুখার্জ্জী। জানালেন, হাসপাতাল বন্ধ করে এভাবে আন্দোলন চালানোয় তাঁরা কঠিন সমস্যায় পড়লেন। একইসঙ্গে সাতগেছিয়া থেকে মাথায় সমস্যা নিয়ে রোগীকে নিয়ে এসেছিলেন অন্নপূর্ণাদেবী। জানিয়েছেন, দ্রুত চিকিত্সার প্রয়োজন ছিল রোগীর।
কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ। এখন ওই রোগীকে নিয়ে তাঁদের ফিরে যেতে হচ্ছে বাড়িতে। এদিকে, জুনিয়র ডাক্তারদের এই আন্দোলনের মাঝেই বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকা কালনার সিঙ্গারকোণের বাসিন্দা দশম শ্রেণীর ছাত্রীটি মারা গেলেন। অভিযোগ উঠেছে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের জেরেই তাঁর সঠিক চিকিত্সা হয়নি। আর তার জেরেই গত প্রায় ১৪দিন ধরে লড়াই শেষে তাঁর মৃত্যু হল। উল্লেখ্য, এই ঘটনায় কালনার সিরিয়াল কিলার কামরুজ্জামান সরকারের নাম জড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর চিকিত্সার বিষয়ে যে গুরুত্ব দেওয়ার কথা ছিল তা দেওয়া হচ্ছিল না বলে ইতিমধ্যেই জেলা যুব কংগ্রেসের সভা্পতি গৌরব সমাদ্দার অভিযোগ তুলেছিলেন।
আর গত ২দিন ধরে জুনিয়র ডাক্তারদের জেরে তার প্রকৃত চিকিত্সা না হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। যদিও হাসপাতাল সূত্রে বলা হয়েছে, ওই ছাত্রীটি নিউরো সমস্যায় ভুগছিলেন। কিন্তু বর্ধমান হাসপাতালে নিউরো চিকিত্সা না হওয়ায় তাকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করার জন্য তার পরিবারকে বলাও হয়। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গোটা বিষয়টি যেহেতু প্রশাসন দেখছে। তাই এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রশাসনই। কিন্তু তারই মাঝে সিরিয়াল কিলারের বিরুদ্ধে মারাত্মক প্রমাণ বিলুপ্ত হয়ে গেল বলে মনে করছেন অনেকেই।