
বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- ছোটবেলা থেকেই বেড়াতে যাবার শখ ও ইচ্ছা ছিল। বাড়ির আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্য সেই সখ পূরণে সমর্থ ছিল না। তারই মধ্যে মাঝেসাঝে বেড়াতে যাওয়া। এরপর স্নাতক হওয়ার পর আসতে আসতে তার পরিমাণ বাড়তে থাকে। ভালো লাগা ও নেশার টানে একসময় হয়ে ওঠেন ট্রাভেল ভ্লগার (Travel Vlogger)। কোভিড পরবর্তী সময়ে এই ভ্লগিং-ই পেশা হয়ে ওঠে বর্ধমানের বাসিন্দা হলেও বর্তমানে কলকাতার গড়িয়ার বাসিন্দা বছর ৩৯-এর শান্তনু গাঙ্গুলীর। স্বপ্ন ছিল আর্থিক অস্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যাঁরা বাইরে বেড়াতে যেতে পারেন না, কোনোদিন সুযোগ পেলে তাদের জন্য কিছু করবেন। এবার শান্তনুর সেই স্বপ্ন সফল হতে চলেছে। বাবা প্রাক্তন সমরকর্মী ছিলেন। সেই সূত্রে শান্তনুর জন্মের পর থেকে ৪ বছর বয়স পর্যন্ত কেটেছে বাগডোগরায়। বয়স খুবই অল্প হলেও সেই সময়কার কিছু আবছা স্মৃতি এখনও তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে। শান্তনু প্রায় ৮ বছর ধরে ট্রাভেল ভ্লগার হিসাবে নিজের তৈরি ‘ভাইরাল স্কোপ’ (Viral Scope) চ্যানেলের মাধ্যমে কাজ করে চলেছেন মূলতই সিকিম এবং উত্তরবঙ্গকে নিয়ে। সম্প্রতি সে আফ্রিকা ভ্রমণ করে এসেছেন। তাঁর ভ্রমণ সংক্রান্ত ভিডিও ব্লগে ভিডিওগ্রাফি, স্ক্রিপ্ট, বাচনভঙ্গী তাঁকে অসংখ্য ভ্রমণপিপাসুর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
শান্তনু জানিয়েছেন, অনেকের স্বপ্ন থাকে বাইরে বেড়াতে যাওয়া। কিন্তু আর্থিক কারণে তাঁদের স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। তিনি এবার তাঁদের জন্য সিল্ক রুট ভ্রমণের ব্যবস্থা করেছেন। যার নাম দিয়েছেন এক্সপ্লোর দ্য সিল্ক রুট উইথ ভাইরাল স্কোপ এণ্ড ট্রাইবাল ট্যুরস এণ্ড ট্রাভেলস। ভ্রমণ পথে রাতে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে সিকিমের লুংচুক, জুলুক এবং রোলেপের হোমস্টেতে। শান্তনু জানিয়েছেন, আগামী ২০২৬ সালের ৮ থেকে ১২ ফেব্রুয়ারী মোট ১৫ জনকে নিয়ে এই স্বপ্ন পূরণ করতে চলেছেন যাঁদের আয় হতে হবে সীমিত এবং বয়স হতে হবে ১০ থেকে ৫০-এর মধ্যে।
ইতিমধ্যেই অনলাইনে (v.scope.yt@gmail.com) আবেদন করতে বলা হয়েছে। এই আবেদনের সঙ্গে ভ্রমণে ইচ্ছুকদের আয় সংক্রান্ত একটি সঠিক তথ্য দিয়ে ইমেলের মাধ্যমে পাঠাতে হবে চলতি ৩১ অক্টোবরের মধ্যে। এই আবেদনগুলিকে যাচাই করে তা থেকে বাছাই করে এই ভ্রমণে নিয়ে যাওয়া হবে। এজন্য মাথা পিছু খরচ নেওয়া হবে ২২৫০ টাকা। যেখানে কমবেশি মাথা পিছু খরচ হয়ে থাকে সাধারণভাবে ৮-১০ হাজার টাকা। শান্তনু জানিয়েছেন, তাঁর এই আবেদনে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছেন ট্রাইবাল ট্যুরস এণ্ড ট্রাভেলসের কর্ণধার রোশন রাই। ওই তিনটে জায়গাতেই তাঁদের হোম স্টে আছে। রোশন রাইও চাইছেন এই ধরনের একটা কাজে নিজেকে যুক্ত করতে।
শান্তনু জানিয়েছেন, রোশন রাইয়ের সাথে গল্প করতে করতে তাঁকে এই ইচ্ছার কথা বলায় তিনি রাজি হয়ে যান। রোশন রাই জানান পেশার বাইরে গিয়ে তিনিও এই কর্মকান্ডের সঙ্গে থাকবেন। এছাড়াও শান্তনুর এক বন্ধু শুভজিৎ মন্ডল নিজে থেকেই কিছু আর্থিক সহযোগিতা করবেন বলে জানিয়েছেন। শান্তনু জানিয়েছেন, তিনিও এক সময় টাকার জন্য ইচ্ছে মতো বেড়াতে যেতে পারতেন না। কখনও কখনও বন্ধুদের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে ঘুরতে গেছেন, পরে আসতে আসতে সেই অর্থ শোধ করেছেন। তাঁর এই ভ্রমণের জন্য তিনি এই ধরনের মানুষদেরকেই চাইছেন। যাতে তাঁরা সহজেই যেতে পারেন এবং তাঁদের মধ্যে একটা ভালো নেশা তৈরি হয়। তাঁরা বিভিন্ন জিনিস দেখে শিখবেন। এখন সবাই সবাইকে শত্রু মনে করেন। এটা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে দেখে বোঝা উচিত সেখানকার মানুষ কীভাবছেন।
শান্তনু জানিয়েছেন, এই খরচে তাঁরা নিউ জলপাইগুড়ি রেলস্টেশন (এনজিপি) থেকে পর্যটকদের নিয়ে যাবেন। তাঁদের তিনবেলা খাবার, থাকার ব্যবস্থা, গাড়ি, পার্কিং, চালকের থাকা খাওয়া এবং পারমিটের ব্যবস্থা করবেন। এর বাইরে ব্যক্তিগত খরচ বা ট্রেন, বাস ইত্যাদির খরচ তাঁরা বহন করবেন না। এমনকি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অতিরিক্ত খরচও তাঁরা বহন করবেন না। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর মূল লক্ষ্য আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকাদের স্বপ্ন পূরণ করা। যেটুকু খরচ হিসাবে তাঁরা নিচ্ছেন তা ন্যূনতম থেকেও কম। শান্তনু জানিয়েছেন, যিনি সত্যিই ভ্রমণের জন্য ছটফট করছেন কিন্তু আর্থিক কারনে যেতে পারছেন না, তাঁদেরকেই নিয়ে যেতে চাইছেন তারা। যে গেলে তাঁর ভবিষ্যত ভালো হবে। অনেক কিছু শিখবেন। ইতিমধ্যে প্রায় ৪৫ টা আবেদন তাঁদের কাছে এসে পৌছেছে। কয়েকজন ৪০-৫০ হাজার আয়ের মানুষ আবেদন করেছেন। তাঁদের নেওয়া হবে না। এমন একজন যোগাযোগ করেছেন যিনি চাষবাস করে চাকরির চেষ্টা করছেন, ওই ব্যক্তিকে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।
শান্তনু জানিয়েছেন, এই রকম মানুষদের নেওয়া খুব দরকার। তাঁরা চান মানুষ ভালো করে বুঝুক ব্যাপারটা। সেটা এক সঙ্গে অনেককে নিয়ে গেলে হবে না। তখন শুধু ঘোরাই হবে। শুধু কয়েকটা ঝর্ণা, পাহাড়, বৌদ্ধ মন্দির দেখাই নয় গ্রামে ঘোরা, সেখানকার মানুষ, প্রকৃতি, পরিবেশ, খাদ্য, সংস্কৃতিকে দেখা, বোঝার জন্যই আমাদের এই ভ্রমণ। ঝর্ণা, পাহাড়, বৌদ্ধ মন্দির এগুলোতো দেখবেই তার সাথে অন্যগুলোও আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তাই তাঁরা একসঙ্গে অনেকে মানুষকে নিয়ে যেতে পারছেন না। এছাড়াও তাঁদের আর্থিক সঙ্গতির বিষয়টিও রয়েছে। তবে এরপর প্রত্যেক বছরে বেশ কয়েকবার এই ধরণের ভ্রমণের ব্যবস্থা করার ইচ্ছা আছে বলে জানিয়েছেন শান্তনু গাঙ্গুলী। 
E Purba Bardhaman Purba Bardhaman District News