
গণেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, বর্ধমান (পূর্ব বর্ধমান) :- বর্ধমানে মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলের প্রাক্তনীদের প্রদর্শনী খেলায় জিতল সবুজ মেরুন। শুক্রবার বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাইস্কুলের মাঠে তারা সাডেন ডেথে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে দেয়। দীর্ঘদিন শহরে বড় ফুটবলের আসর বসেনি। তাই এদিন ব্যারেটো, মেহেতাব, অ্যালভিটো, রহিম নবিদের দেখতে প্রচুর সংখ্যক দর্শক মাঠে ভিড় করেছিলেন। মাঠে দু’পাশে দু’দলের ফ্যানদের বসার আলাদা ব্যবস্থা ছিল। মেরিনার্স ও লাল হলুদের সমর্থকরা বিশাল বিশাল দলীয় পতাকা, টিফো নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন তাঁদের প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে। দর্শকদের অনেকেই তাঁদের প্রিয় দলের জাির্স পরে হাজির হয়েছিলেন।
ঘাসহীন অসমান মাঠে ঝুঁকি নিয়েও দু’দলের খেলোয়াড়রা নিজেদের উজার করে দিয়েছেন। প্রদর্শনী ম্যাচ হলেও দু’দলের খেলোয়াড়দের ম্যাচ জেতার জন্য লড়াই দর্শকদের প্রত্যাশা ষোল আনা মিটিয়ে দিয়েছে। বেশ উপভোগ্য হয়েছে খেলাটি। 
এদিন দু’দলেই বেশ কয়েকজন প্রাক্তন জাতীয় দলের খেলোয়াড় ছিলেন। তবে, রফিকের জোড়া গোল এবং বিপজ্জনক দৌড়কে টেক্কা দিয়ে দর্শকদের মন জয় করে নিলেন সবুজ মেরুনের ভরসা ব্যারেটো। মেহেতাব হোসেনের মাঝমাঠে নেতৃত্ব দেওয়া, রহিম নবির মাঠ জুড়ে খেলা কিংবা দীপক মণ্ডলের বিখ্যাত স্লাইডিং ট্যাকেল দেখে দর্শকরা হাততালি দিয়েছেন। কিন্তু, ম্যাচের একেবারে শেষ মুহূের্ত ব্যারেটোর দুর্দান্ত গোল দর্শকদের উচ্ছ্বাসে ভরিয়ে দিয়েছে। বেহাল মাঠে চোট লাগার সম্ভাবনা থেকেই যায়। কিন্তু, দলকে বিপদমুক্ত করতে দীপকের বেশ কয়েকবার স্লাইডিং ট্যাকেল করে বিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া প্রদর্শনী ম্যাচের সঙ্গে মানানসই নয়। বরং ম্যাচ না হারার মানসিকতাকেই তুলে ধরে। খেলা চলাকালীন দলের খেলোয়াড়রা ভুল করলেই মেহেতাবের বকা-ঝকা বুঝিয়ে দিচ্ছিল প্রদর্শনী হলেও দু’দলের সম্মানের লড়াইয়ে কেউই হারতে চান না। খেলা শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্দান্ত গোল করে ইস্টবেঙ্গলকে এগিয়ে দেন মহম্মদ রফিক। তাঁর ডান পায়ের জোড়ালো গ্রাউন্ডার সন্দীপ নন্দীকে পরাস্ত করে জাল কাঁপিয়ে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আরও একটি গোল করে ইস্টবেঙ্গল। বাঁদিক থেকে সৌমিকের মাপা সেন্টারে মেহেরাজউদ্দিন ও কিংশুক দেবনাথকে স্পট জাম্পে পরাস্ত করে একেবারে জ্যামুক্ত তিরের মতো লাফিয়ে উঠে মাথা ছুঁইয়ে বল জালে পাঠান রফিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যবধান কমানোর সুযোগ পায় মোহনবাগান। কিন্তু, অসীম বিশ্বাসের জোড়ালো শট বারের উপর দিয়ে চলে যায়। প্রথমাের্ধর একেবারে শেষদিকে রহিম নবির বাঁ পা ঝলসে ওঠে। তাঁর জোড়ালো শট ইস্টবেঙ্গলের গোলরক্ষক শুভাশিস রায়চৌধুরীকে পরাস্ত করে জালে জড়িয়ে যায়। 
প্রথমাের্ধ ব্যারেটো একটু নিস্প্রভ ছিলেন। মাঝমাঠ থেকে সেভাবে বল না পেয়ে তিনি নীচে নেমে আসছিলেন। তার উপর সবুজ তোতাকে কড়া ম্যানমাির্কংয়ে রাখে ইস্টবেঙ্গল। দ্বিতীয়াের্ধ সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে মোহনবাগান। নবি, অসীম এবং মেহেরাজ এই অর্ধে বেশ ভালো খেলেন। ডানপ্রান্ত থেকে বেশ কয়েকবার ব্যারেটো দুর্দান্ত আক্রমণ করেন। একটি ক্ষেত্রে তাঁর সিল্ডিং ছিল দেখার মতো। তাঁর একটি মাপা সেন্টারে মাথা ছোঁয়াতে ব্যর্থ হন নবি। মোহনবাগান জনতার কাছে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষার ভরসা ছিলেন ব্যারেটো। এদিনও সমতা ফেরালেন একটি দৃষ্টিনন্দন গোল করে। ডানদিক থেকে গড়ানো বল পেয়ে চট করে মাটি থেকে তা তুলে নেন ব্যারেটো। তাঁর সঙ্গে গায়ে লেগে থাকা ডিফেন্ডাররা ভেবেছিলেন, তিনি হয়তো ব্যাকভলি করবেন। তা না করে ডিফেন্ডারের মাথার উপর দিয়ে বল তুলে নিয়ে বাঁ পায়ের ভলিতে সমতা ফেরালেন সবুজ তোতা। টাইব্রেকারে দু’দলই চারটি করে গোল করে। সাডেন ডেথে দু’টি গোল করে মোহনবাগান। ইস্টবেঙ্গলের দীপঙ্করের বাঁদিকের কোমর সমান উচ্চতার শট ঝাঁপিয়ে আটকে দলকে জয় এনে দেন সন্দীপ। 
মোহনবাগান-ইষ্টবেঙ্গলের প্রাক্তনীদের এই ডার্বি ম্যাচকে কেন্দ্রে করে মাঠে মনোরঞ্জনের সব ব্যবস্থাই ছিল। তবে, মাঠের বেহাল অবস্থা ও দর্শকদের নিয়ন্ত্রণে আনার ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আয়োজকদের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। জাতীয় দলের প্রাক্তন তারকাদের হাতের কাছে পেয়ে তাঁদের কাছে পৌঁছানোর যে আকুল চেষ্টা দর্শকদের থাকবে তা আঁচ করা উচিত ছিল আয়োজক ও পুলিশ-প্রশাসনের। কিন্তু, মাঠের ভিতরে চলে যাওয়া দর্শকদের সরানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা নজরে এসেছে। পরিস্থিতি যা ছিল তাতে খেলোয়াড় ও দর্শকদের আঘাত লাগার সম্ভাবনা ছিল। আর মাঠের যা অবস্থা তা বোধহয় চাষের জমিকেও হার মানায়। তবে, ঘাসহীন অসমান মাঠে অবশ্য ঝুঁকি নিয়েও দু’দলের খেলোয়াড়রা নিজেদের উজার করে দিয়েছেন। 
শিশিরসাথী ফাউন্ডেশনের উদোগে বর্ধমান শহরে আয়োজিত এদিনে এই ম্যাচ দেখতে মাঠে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ, পূর্ব বর্ধমান জেলা পরিষদের সভাধিপতি শ্যামাপ্রসন্ন লোহার, সহকারী সভাধিপতি গার্গী নাহা, বর্ধমান উন্নয়ণ সংস্থার চেয়ারম্যান উজ্জ্বল প্রামাণিক, ভাইস চেয়ারম্যান আইনুল হক, জেলার পুলিশ সুপার সায়ক দাস, বর্ধমান পুরসভার চেয়ারম্যান পরেশচন্দ্র সরকার, শিশিরসাথী ফাউন্ডেশনের সম্পাদক রাসবিহারী হালদার প্রমুখ। 
E Purba Bardhaman Purba Bardhaman District News